মানবাধিকারের লড়াই থেকে নোবেল জয়, কে এই নাভি পিল্লাই?
- 1
নানা পাটেকারের জীবনের অজানা ১০ তথ্য | সংগ্রাম, পরিবার ও অভিনয়
- 2
মৃত্যুর আগে বন্ধুকে বার্তা, ধীরে ধীরে হারাচ্ছিলেন চেতনা—নানা পাটেকরের শেষ সময়ের ঘটনা
- 3
মেসির মতো বিদায় প্রাপ্য রোনালদোরও, বললেন গ্যারি লিনেকার
- 4
আবু ধাবির গরমে শান্তদের আফগান পরীক্ষা, নতুন অভিজ্ঞতার সামনে বাংলাদেশ
- 5
নতুন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্টেডিয়ামের উদ্বোধনে থাকতে চান ফার্গুসন—‘শরীরে না থাকলেও আত্মায়’

মানবাধিকারের লড়াই থেকে নোবেল জয়, কে এই নাভি পিল্লাই?
মানবাধিকারের লড়াই থেকে নোবেল জয়, কে এই নাভি পিল্লাই?
যুদ্ধ, গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। সেই লড়াইয়ে কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই এবার পেলেন সেই অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের মানুষের আইনের অধিকার প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার এবং সংঘাতের শিকার মানুষের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন নাভি পিল্লাই।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর নানা চাপের এই সময়ে তার সাহস, দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক।
কে এই নাভি পিল্লাই?
নাভানেথেম নাইডু নামে ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের পরিবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং তামিল। তার বেড়ে ওঠার সময় দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল বর্ণবাদী বৈষম্য ও নিপীড়নে জর্জরিত।
সমাজের বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইনকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন পিল্লাই। আইনজীবী হিসেবে তিনি দরিদ্র, প্রান্তিক ও শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ শুরু করেন।
১৯৬৭ সালে নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি নিজস্ব ল’ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন ওই প্রদেশের প্রথম নারী আইনজীবী এবং সেখানে নিজস্ব ল’ফার্ম প্রতিষ্ঠা করা প্রথম নারীও।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে ডক্টর অব জুরিডিক্যাল সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পিল্লাই নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। তার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল দেশটির বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার আইনজীবী হিসেবে কাজ করা।
১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান পিল্লাই। এর পরপরই তার কর্মজীবন জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৯৫ সালেই রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডার বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হন পিল্লাই। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করেন।
সেখানেই তিনি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে যুদ্ধকালীন পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠিত হয় যে, কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত যৌন সহিংসতাও গণহত্যার আওতায় পড়তে পারে।
এই রায়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পিল্লাই বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধর্ষণকে যুদ্ধের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন থেকে এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নারীর অধিকার ও যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে এই রায়কে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘ পথচলা
রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের পর পিল্লাইয়ের কর্মপরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সংঘাত ও সহিংসতার শিকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন পিল্লাই। বর্তমানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলার বিচারিক কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে আজীবন লড়াই
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা বাড়ানো, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির মতে, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাতের অহিংস সমাধানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন অপরিহার্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান ও বিচারকদের যখন বিভিন্ন চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে, তখন পিল্লাইয়ের মতো সাহসী ও দূরদর্শী মানুষের প্রয়োজন আরও বেশি।
নোবেল কমিটি তার দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি পিল্লাইয়ের অঙ্গীকার আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে আগ্রহী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা।
যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় নিজের একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।













