ব্রাজিলের ফুটবলাররা কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারছেন না?

ব্রাজিলের ফুটবলাররা কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারছেন না?
ব্রাজিলের ফুটবলাররা কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারছেন না?
একসময় ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ানদের উপস্থিতি ছিল প্রায় নিয়মিত। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও কিংবা কাকার মতো তারকারা একের পর এক বিশ্বসেরার স্বীকৃতি এনে দিয়েছেন ব্রাজিলকে। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত।
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরে ব্রাজিলের সবচেয়ে উঁচুতে থাকা খেলোয়াড় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র—১৭তম। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ২১তম এবং মারকিনিওস ২৫তম হয়েছেন। অর্থাৎ ১৬ বছর পর আবারও ব্রাজিলের সেরা প্রতিনিধি পুরুষদের ব্যালন ডি’অরে ১৭তম বা তার নিচে শেষ করলেন।
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু ২০২৬ সালের ফল নিয়ে নয়। বরং আরও বড় প্রশ্ন—যে ব্রাজিল একসময় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিভার কারখানা ছিল, সেই দেশের ফুটবলাররা এখন কেন ব্যালন ডি’অরের সবচেয়ে উঁচু মঞ্চে নিয়মিত জায়গা করে নিতে পারছেন না?
শেষবার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন কাকা
ব্রাজিলের কোনো ফুটবলারের হাতে সর্বশেষ মূল ব্যালন ডি’অর উঠেছিল ২০০৭ সালে। সেবার এসি মিলানের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে পুরস্কার জিতেছিলেন কাকা। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক, কিন্তু ব্রাজিলের আর কোনো পুরুষ ফুটবলার পুরস্কারটি জিততে পারেননি।
ব্রাজিলের অফিসিয়াল ব্যালন ডি’অর জয়ী চারজন—রোনালদো ১৯৯৭ ও ২০০২ সালে, রিভালদো ১৯৯৯ সালে, রোনালদিনিও ২০০৫ সালে এবং কাকা ২০০৭ সালে।
২০২৬ সালের ফলাফল আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। ২০১০ সালের পর এবারই প্রথম ব্রাজিলের সেরা খেলোয়াড় ১৭তম বা তার নিচে অবস্থান করেছেন। ২০১০ সালে মাইকন ১৭তম হয়েছিলেন।
একসময় ছিল রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনিও-কাকার যুগ
১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অরের নিয়মে বড় পরিবর্তন আসে। ইউরোপীয় ক্লাবে খেলা অ-ইউরোপীয় ফুটবলাররাও তখন থেকে পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান। এরপরই ব্রাজিলিয়ান তারকারা পুরস্কারের মঞ্চে নিজেদের প্রভাব দেখাতে শুরু করেন।
১৯৯৭ থেকে ২০০৭—এই ১১ বছরে ব্রাজিল চারবার ব্যালন ডি’অর জিতেছে। রোনালদো দুইবার, রিভালদো একবার, রোনালদিনিও একবার এবং কাকা একবার।
শুধু জয় নয়, শীর্ষ তিনেও ব্রাজিলিয়ানদের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে মাত্র চারটি সংস্করণে ব্রাজিলের কেউ সেরা তিনে ছিলেন না। সেই সময়ে ব্রাজিল যেন সত্যিই বিশ্ব ফুটবলের প্রতিভা তৈরির কারখানা।
একজন তারকা বিদায় নেওয়ার আগেই উঠে আসতেন আরেকজন।
তারপর এল মেসি-রোনালদোর দীর্ঘ রাজত্ব
ব্রাজিলের পতনের গল্পে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যুগের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না।
২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাত্র দুজন ফুটবলার—মেসি ও রোনালদো—মিলে আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। এই সময় অন্য দেশের অসাধারণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্যও পুরস্কার জেতা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৮ সালে লুকা মদরিচ সেই আধিপত্যে বড় ধাক্কা দেন। এরপর করিম বেনজেমা ও রদ্রিও পুরস্কার জিতেছেন। ২০২৬ সালে হ্যারি কেইনও প্রথমবারের মতো নিজের হাতে সোনালি বল তুলেছেন।
কিন্তু মেসি-রোনালদোর আধিপত্যের বাইরে ব্রাজিলের নিজেদের সমস্যাটিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
নেইমার ছিলেন সবচেয়ে বড় আশা
কাকার পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ব্যালন ডি’অর আশা ছিলেন নেইমার।
২০১৫ ও ২০১৭ সালে তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে মেসি ও রোনালদোর পেছনে, আর ২০১৭ সালে একই দুই তারকার পেছনেই ছিলেন তিনি। কিন্তু শীর্ষ তিনে জায়গা করে নেওয়া আর ব্যালন ডি’অর জেতা এক বিষয় নয়।
নেইমারের প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্ন ছিল ধারাবাহিকতা, চোট এবং ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারফরম্যান্স ধরে রাখা নিয়ে।
ফলে ব্রাজিলের পরবর্তী ব্যালন ডি’অর জয়ীর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে।
ভিনিসিয়ুসও পারেননি প্রত্যাশা পূরণ করতে
২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দ্বিতীয় হয়ে ব্রাজিলকে আবার ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ দুইয়ে ফিরিয়েছিলেন। তখন অনেকের চোখেই তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ বিজয়ী।
কিন্তু ২০২৫ সালে ১৬তম এবং ২০২৬ সালে ১৭তম হয়ে সেই প্রত্যাশা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন তিনি। ২০২৬ সালে ব্রাজিলের তিনজন খেলোয়াড়ই সেরা ৩০-এ ছিলেন—ভিনিসিয়ুস ১৭তম, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ২১তম ও মারকিনিওস ২৫তম।
অর্থাৎ ভিনিসিয়ুসের ২০২৪ সালের দ্বিতীয় স্থানকে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের নতুন উত্থানের সূচনা বলা যাচ্ছে না।

সমস্যাটা কি প্রতিভা তৈরির কাঠামোতে?
ব্রাজিলের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগুলোর একটি আসে বয়সভিত্তিক ফুটবল কাঠামো থেকে।
ব্রাজিলে ঐতিহাসিকভাবে স্ট্রিট ফুটবল, ফুতসাল, ছোট মাঠে খেলা এবং স্বাধীনভাবে বল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সংস্কৃতি অসংখ্য সৃষ্টিশীল ফুটবলার তৈরি করেছে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে বয়সভিত্তিক একাডেমি, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশল ও ফলাফলনির্ভর প্রশিক্ষণ ক্রমেই বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
ফ্ল্যাশস্কোরের ব্রাজিল অঞ্চলের পরিচালক আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোসের বিশ্লেষণও মূলত এই জায়গাতেই। তার মতে, সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক ও সেন্টার ফরোয়ার্ড তৈরির ক্ষেত্রে যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেটি বয়সভিত্তিক ফুটবলের কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ শুধু প্রতিভাবান শিশু খুঁজে পেলেই হবে না; সেই প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার পুরো প্রক্রিয়াটিকেও আধুনিক করতে হবে।
হারিয়ে যাচ্ছে স্ট্রিট ফুটবলের স্বাধীনতা?
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের অন্যতম বড় শক্তি ছিল রাস্তার ফুটবল।
গলি, সমুদ্রসৈকত কিংবা খোলা মাঠে ছোট জায়গায় বল নিয়ে খেলা—সেখানে কোনো কোচের বাঁধাধরা নির্দেশ ছিল না। ছিল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, ড্রিবলিং, কল্পনা এবং প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর স্বাধীনতা।
রোমারিওর মতো কিংবদন্তিরা মনে করেন, এই পরিবেশই ব্রাজিলের সৃষ্টিশীল ফুটবলার তৈরির অন্যতম বড় কারণ ছিল।
কিন্তু এখন তরুণদের ফুটবল অনেক বেশি সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং ফলাফলকেন্দ্রিক। এতে শৃঙ্খলা বাড়লেও সহজাত সৃষ্টিশীলতার জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু সৃষ্টিশীলতার সমস্যা নয়
ব্রাজিলের সমস্যাকে শুধু ‘জাদুকর ফুটবলার কমে গেছে’ বলে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়।
আধুনিক ফুটবলে গতি, শক্তি, প্রেসিং, পজিশনাল বোধ, রক্ষণে অবদান এবং ধারাবাহিকতা—সবকিছুর মূল্য বেড়েছে। একজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে শুধু গোল বা ড্রিবলিং দিয়ে নয়, পুরো ম্যাচে তার প্রভাব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।
ব্রাজিল থেকে এখনও প্রতিভাবান খেলোয়াড় বের হচ্ছেন। রাফিনিয়া, ভিনিসিয়ুস, এস্তেভাওদের মতো খেলোয়াড়রা তার উদাহরণ। কিন্তু বিশ্বসেরার পর্যায়ে একসঙ্গে একাধিক খেলোয়াড়কে তুলে আনার মতো গভীরতা এখনো তৈরি হয়নি।
একজন তারকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
রোমারিওর আরেকটি বক্তব্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—একটি জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ শুধু একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে তৈরি করা যায় না।
কাকার পর ব্রাজিলের স্বপ্ন অনেকটাই প্রথমে নেইমার, পরে ভিনিসিয়ুসকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। একজন তারকা যখন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না, তখন পুরো দেশের বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্নও ধাক্কা খায়।
এর বিপরীতে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলো একই সময়ে একাধিক বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে পেরেছে।
সংখ্যাতেও স্পষ্ট ব্রাজিলের পিছিয়ে পড়া
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে ব্রাজিলের পাঁচটি পুরুষ পুরস্কার রয়েছে—রোনালদো দুইবার, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকা একবার করে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের আটটি করে, পর্তুগাল, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের সাতটি করে পুরুষ ব্যালন ডি’অর রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—১৯৯৫ সালের আগে অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড়রা এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য ছিলেন না। তাই ব্রাজিলের ঐতিহাসিক সংখ্যা তাদের প্রকৃত ফুটবল-প্রভাবের পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
তাহলে কি ব্রাজিলের সোনালি সময় শেষ?
পুরোপুরি নয়।
ব্রাজিল এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল প্রতিভা রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতেও নিয়মিত ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় দেখা যায়। নতুন প্রজন্মে রাফিনিয়া, এস্তেভাও এবং আরও অনেকে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।
কিন্তু ব্যালন ডি’অর জিততে হলে শুধু অসাধারণ প্রতিভা থাকলেই হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, বড় ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাফল্য, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব এবং একটি পূর্ণ মৌসুমজুড়ে নিজেকে সবার ওপরে প্রমাণ করা।
কাকা ২০০৭ সালে শেষবার ব্রাজিলকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর ১৯ বছর ধরে অপেক্ষা চলছে।
২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুসের দ্বিতীয় স্থান হয়তো আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৭তম স্থান আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—ব্রাজিলের সমস্যা শুধু একজন ব্যালন ডি’অর জয়ীর অভাব নয়; বিশ্বসেরা হওয়ার মতো ধারাবাহিক প্রজন্ম তৈরির কাঠামো নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন।
ব্রাজিল যদি আবার ফুটবল-জাদুর সেই পুরোনো পরিচয় ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে হয়তো শুধু নতুন নেইমার বা নতুন রোনালদো খুঁজলেই হবে না। তৈরি করতে হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একসঙ্গে অনেক প্রতিভা বেড়ে উঠবে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন বিশ্ব ফুটবলের একেবারে শীর্ষে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।













