মেরিলিন মনরো ও হেলেন অব ট্রয়কে এক সুতোয় গেঁথেছেন নোবেলজয়ী অ্যান কার্সন

মেরিলিন মনরো ও হেলেন অব ট্রয়কে এক সুতোয় গেঁথেছেন নোবেলজয়ী অ্যান কার্সন
মেরিলিন মনরো ও হেলেন অব ট্রয়কে এক সুতোয় গেঁথেছেন নোবেলজয়ী অ্যান কার্সন
২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সন। ধ্রুপদি সাহিত্য ও পুরাণের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি বিশেষ দিক হলো, প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্রদের তিনি আধুনিক সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এরই উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’—যেখানে পাশাপাশি উঠে এসেছেন হলিউড তারকা মেরিলিন মনরো ও গ্রিক পুরাণের হেলেন অব ট্রয়।
মেরিলিন মনরোকে নিয়ে পৃথিবীতে কম লেখা হয়নি। হলিউডের স্বর্ণযুগের এই কিংবদন্তি তারকার জীবন, সৌন্দর্য, প্রেম, একাকিত্ব ও রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বই, সিনেমা ও গবেষণা। কিন্তু তাঁকে যখন প্রায় তিন হাজার বছর আগের গ্রিক পুরাণের এক নারীর সঙ্গে একই কাহিনিতে নিয়ে আসেন কোনো সাহিত্যিক, তখন পরিচিত গল্পটিও নতুন অর্থ পায়।
কার্সনের এই কাজেই মেরিলিন মনরোর সঙ্গে হেলেন অব ট্রয়ের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। দুজনের সময়কাল আলাদা, তাঁদের জীবন ও পরিচয়ও ভিন্ন। তবু তাঁদের ঘিরে মানুষের আকর্ষণ, কল্পনা ও সৌন্দর্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মিল খুঁজেছেন লেখক।
হেলেন অব ট্রয় ও মেরিলিন: সৌন্দর্যের আড়ালে ব্যক্তিসত্তা
গ্রিক পুরাণে হেলেন অব ট্রয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করেই ট্রয়ের যুদ্ধের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। অন্যদিকে, মেরিলিন মনরো ছিলেন বিংশ শতকের হলিউডের অন্যতম আলোচিত তারকা। তাঁর আবেদনময়ী পর্দা-ব্যক্তিত্ব তাঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দেয়।
তবে কার্সনের দৃষ্টিতে এই দুই নারীর গল্পের মিল কেবল সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের ব্যক্তিসত্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক সময় অন্যদের চোখে তাঁদের আকর্ষণই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের কীভাবে দেখা হয়, তাঁদের গল্প কে বলে এবং সেই গল্প কীভাবে তাঁদের পরিচয় তৈরি করে—এসব প্রশ্নই উঠে এসেছে কার্সনের রচনায়।

‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’ কী নিয়ে?
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের দ্য শেডের গ্রিফিন থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’। এটি অ্যান কার্সনের লেখা একটি ব্যতিক্রমী মঞ্চকর্ম, যেখানে কথন ও সংগীতের মিশ্রণে হেলেন অব ট্রয় ও মেরিলিন মনরোর গল্প নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মেরিলিনের জন্মনাম ছিল নর্মা জিন বেকার। সেই নামের সঙ্গে হেলেন অব ট্রয়ের নাম যুক্ত করেই কার্সন তৈরি করেছেন রচনাটির শিরোনাম। এতে অভিনয় করেন বেন উইশ ও সোপ্রানো রেনে ফ্লেমিং। পরিচালনায় ছিলেন কেটি মিচেল।
রচনাটির বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল দুই বিখ্যাত সুন্দরীর তুলনামূলক গল্প নয়। বরং নারীদের জীবন ও পরিচয় নিয়ে প্রচলিত বয়ানকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। ইতিহাস, পুরাণ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির চরিত্রগুলোকে পাশাপাশি রেখে কার্সন দেখিয়েছেন, সময় বদলালেও নারীদের নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
কেন অ্যান কার্সনের লেখায় ধ্রুপদি সাহিত্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যান কার্সনের সাহিত্যজগৎ প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে তিনি ধ্রুপদি সাহিত্যকে শুধু অতীতের নিদর্শন হিসেবে দেখেন না; বরং সেগুলোর সঙ্গে বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতার কথোপকথন তৈরি করেন। কবিতা, গদ্য, নাটক ও অনুবাদের প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে লেখার ধরনও তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তাঁর বহুল আলোচিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের প্রভাবের পাশাপাশি ভাষা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও মানবিক অভিজ্ঞতার জটিলতা উঠে আসে।
২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার ঘোষণায় সুইডিশ অ্যাকাডেমি কার্সনের সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের কথা তুলে ধরে। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল সংলাপ সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ তৈরি করেছে—এ স্বীকৃতিই তাঁর নোবেলজয়ের মূল ভিত্তি।
মেরিলিন মনরো ও হেলেন অব ট্রয়কে একই সাহিত্যিক পরিসরে নিয়ে এসে কার্সন যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা তাঁদের সৌন্দর্য কিংবা খ্যাতির বাইরেও বিস্তৃত। একজন নারীকে নিয়ে গল্প তৈরি হলে সেই গল্পের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকে, আর সেই গল্পে তাঁর নিজের কণ্ঠ কতটা শোনা যায়—‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’ সেই প্রশ্নগুলোই সামনে আনে।














