সুন্দরবনে বদলে যাচ্ছে গাছের আধিপত্য, কমছে সুন্দরী-গেওয়া; বাড়ছে কাঁকড়ার বিস্তার
- 1
মাছরাঙার ইনস্টাগ্রামে তারকাদের ভুয়া ভিডিও: হ্যাকের দাবি
- 2
সিনেমায় অভিনয়ের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব, পরিচালকের নম্বর ব্লক করেন নীতি টেলর
- 3
এআই দিয়ে বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি নিয়ে ক্ষুব্ধ মেহজাবীন
- 4
মাকে নিয়ে অপপ্রচারে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি মৌসুমীপুত্র ফারদিনের
- 5
এক গোল খেয়ে চার গোল দিল বার্সেলোনা, টানা ১০ জয়

সুন্দরবনে বদলে যাচ্ছে গাছের আধিপত্য, কমছে সুন্দরী-গেওয়া; বাড়ছে কাঁকড়ার বিস্তার
সুন্দরবনে বদলে যাচ্ছে গাছের আধিপত্য, কমছে সুন্দরী-গেওয়া; বাড়ছে কাঁকড়ার বিস্তার
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সুন্দরবনে বীজ থেকে নতুন চারা তৈরির ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে লবণাক্ততার বিভিন্ন অঞ্চলে গাছের প্রজাতিগত আধিপত্যেও পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরী গাছের আধিপত্য কমার পাশাপাশি গেওয়া এবং কিছু অঞ্চলে কাঁকড়া গাছের বিস্তার বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BFRI) ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের গবেষকদের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে ৩০টি পার্মানেন্ট স্যাম্পল প্লটের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ১৪ প্রজাতির চারা (seedling), ১০ প্রজাতির ছোট গাছ (sapling) এবং ১০ প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক গাছের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এক দশকে অর্ধেকের বেশি বীজ হারিয়েছে
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো—২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে মোট seedling density ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। তবে একই সময়ে sapling-এর সংখ্যা বেড়েছে ২৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন বীজ বা চারার একটি বড় অংশ টিকে থাকতে না পারলেও যেসব চারা পরবর্তী ধাপে পৌঁছেছে, তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। কম লবণাক্ত অঞ্চলে seedling density কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় ৩৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং বেশি লবণাক্ত অঞ্চলে কমেছে ৮২ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
অন্যদিকে sapling density কম লবণাক্ত অঞ্চলে বেড়েছে ৩০১ দশমিক ১ শতাংশ, মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় ৯৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বেশি লবণাক্ত অঞ্চলে ২৩২ শতাংশ। গবেষণাটি দেখায়, সুন্দরবনের পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া শুধু গাছের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না; কোন প্রজাতি কোন পরিবেশে টিকে থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরী গাছের আধিপত্যে পরিবর্তন
গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরী বা *Heritiera fomes*-এর আধিপত্য সময়ের সঙ্গে কমেছে। বিপরীতে গেওয়া বা *Excoecaria agallocha*-এর বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাটি একই সঙ্গে বলছে, সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য সময়ের ব্যবধানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে এবং প্রজাতির পরিবর্তন অঞ্চলভেদে ভিন্ন।
অর্থাৎ সুন্দরবনের সব এলাকায় একই ধরনের পরিবর্তন ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। লবণাক্ততার মাত্রা, মাটি, পানির প্রবাহসহ বিভিন্ন পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গাছের প্রজাতিগত অবস্থান বদলাচ্ছে।
চাঁদপাই রেঞ্জে কাঁকড়ার বিস্তার
২০২৬ সালের আগস্টে *Scientific Reports*-এ প্রকাশিত আরেক গবেষণায় সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে কাঁকড়া (*Bruguiera gymnorhiza*) গাছের দীর্ঘমেয়াদি বিস্তার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা ১৯৮৮, ১৯৮৯, ২০০০, ২০১০ ও ২০২২ সালের Landsat স্যাটেলাইট ছবি এবং অন্যান্য উচ্চ-রেজল্যুশনের তথ্য ব্যবহার করেছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, চাঁদপাই রেঞ্জের গবেষণাধীন এলাকায় সুন্দরী-গেওয়া প্রাধান্যপূর্ণ প্রায় ১,৭৮৫ হেক্টর এলাকা উচ্চ ঘনত্বের কাঁকড়া-প্রধান এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। আরও প্রায় ৩,০০০ হেক্টর এলাকা মাঝারি ঘনত্বের কাঁকড়া-প্রধান অঞ্চলে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে এটি চাঁদপাই রেঞ্জে কয়েক দশকে কাঁকড়ার বিস্তারের পরিমাণগত প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণাটি **পুরো সুন্দরবনের চিত্র নয়**। গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল চাঁদপাই রেঞ্জ। ফলে পুরো সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের জায়গা কাঁকড়া নিয়ে নিয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত এই গবেষণা থেকে দেওয়া যায় না।
কেন বদলাচ্ছে সুন্দরবনের উদ্ভিদপ্রজাতি?
সুন্দরবনের গাছপালার ওপর লবণাক্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত প্রভাবক। ২০২৫ সালের গবেষণায়ও বিভিন্ন salinity zone-এর মধ্যে regeneration-এর পার্থক্য দেখা গেছে। গবেষণায় salinity, siltation, precipitation, soil pHসহ বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদান বিবেচনা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের পানি ও লবণাক্ততার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এর সঙ্গে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ, পলি জমা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও দীর্ঘমেয়াদে বনটির পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
লবণাক্ততা বাড়লে যেসব প্রজাতি বেশি লবণ সহ্য করতে পারে, তাদের জন্য কিছু এলাকায় তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বিপরীতে কম লবণাক্ত পরিবেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল প্রজাতিগুলো সেখানে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
সুন্দরী কমছে মানেই সুন্দরবন শেষ হয়ে যাচ্ছে নয়
গবেষণার ফলাফলকে সুন্দরবনের সামগ্রিক অবক্ষয়ের সরল প্রমাণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না।
২০২৫ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, সুন্দরবনের biodiversity সময়ের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। একই সঙ্গে গবেষকরা দেখেছেন, বিভিন্ন salinity zone-এর মধ্যে species composition-এ পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ বনটি একটি গতিশীল ecosystem, যেখানে প্রজাতির ঘনত্ব ও আধিপত্য সময় এবং পরিবেশের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে সুন্দরীসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না। কারণ সুন্দরবনের ecological balance, carbon storage, biodiversity এবং বনটির সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে বিভিন্ন প্রজাতির পারস্পরিক ভারসাম্যের ওপর।

গবেষণার বড় বার্তা—মনিটরিং আরও জরুরি
সুন্দরবনের পরিবর্তন বোঝার জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তথ্য, permanent sample plot, satellite imagery এবং remote sensing data একসঙ্গে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদপাই রেঞ্জের কাঁকড়া সম্প্রসারণ বিষয়ক গবেষণাটিও দেখিয়েছে, কয়েক দশকের satellite data বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির বিস্তার কীভাবে পরিমাপ করা যায়। গবেষণাটিতে ১৯৮৮ ও ২০২২ সালের classification accuracy যথাক্রমে ৯০ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল।
অন্যদিকে ২০১০-২০২০ সালের regeneration study দেখিয়েছে, seedling থেকে sapling এবং sapling থেকে adult tree হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু বড় গাছের সংখ্যা দিয়ে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে না।
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পানির ভারসাম্যের ওপর
সুন্দরবন এমন একটি ecosystem যেখানে মিঠা পানি ও লবণাক্ত পানির ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হলে গাছের প্রজাতিগত গঠনও বদলাতে পারে।
তাই সুন্দরী, গেওয়া বা কাঁকড়া—কোন প্রজাতি কোথায় বাড়ছে, শুধু সেটি দেখার পাশাপাশি কেন বাড়ছে বা কমছে, কোন salinity zone-এ পরিবর্তন বেশি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সেই পরিবর্তন ecosystem-এর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো সুন্দরবনকে একটি **পরিবর্তনশীল কিন্তু এখনও সক্রিয়ভাবে পুনর্জন্মশীল ecosystem** হিসেবে তুলে ধরছে। তাই উদ্বেগের কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি নিয়মিত গবেষণা, monitoring এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করার সুযোগও রয়েছে।
















