চোট থেকে রাজসিংহাসনে প্রত্যাবর্তন, তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়লেন পুতেয়াস
- 1
মরিনিওর শেষ এল ক্লাসিকোর সেই ১১ তারকা এখন কোথায়, কী করছেন তাঁরা?
- 2
আবারও বিতর্কে নেইমার, ভিএআরে লাল কার্ডের পর প্রতিপক্ষকে হুমকি
- 3
স্তন ক্যানসার সচেতনতায় পাকিস্তানের জার্সি গোলাপি, গাদ্দাফি স্টেডিয়ামেও রঙের ছোঁয়া
- 4
‘এমন ইনিংস জীবনে কখনও দেখিনি’, শাদাবকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত আফ্রিদি
- 5
চাপের মুখে তিলকের ঝলক, রান তাড়ায় শতভাগ জয়ের অনন্য রেকর্ড

চোট থেকে রাজসিংহাসনে প্রত্যাবর্তন, তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়লেন পুতেয়াস
চোট থেকে রাজসিংহাসনে প্রত্যাবর্তন, তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়লেন পুতেয়াস
বার্সেলোনার উত্তরে ছোট্ট এক শহর মোলেত দেল ভালেস। সেখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলেই বড় হয়েছেন এক মেয়ে। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু তাঁকে মুগ্ধ করত, রিভালদো ও রোনালদিনহোর খেলাও টানত চুম্বকের মতো। সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন ক্যাম্প ন্যুতে, প্রিয় বার্সেলোনার খেলা দেখতে।
সেই ছোট্ট মেয়েটিই একদিন হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার রানি—আলেক্সিয়া পুতেয়াস।
ফুটবলবিশ্ব তাঁকে চেনে ‘লা রেইনা’ নামে, যার অর্থ রানি। তবে রানির জীবনেও আসে দুঃসময়। কখনো মুকুট হারানোর ভয়, কখনো সিংহাসন টলে যাওয়ার আশঙ্কা। পুতেয়াসের জীবনেও তেমন এক অধ্যায় এসেছিল। ২০২২ সালে হাঁটুর ভয়াবহ চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে ফেলে দিয়েছিল অনিশ্চয়তার মুখে। চার বছর পর সেই পুতেয়াসই আবার বিশ্বসেরা। তৃতীয়বারের মতো জিতেছেন মেয়েদের ব্যালন ডি’অর।
৩২ বছর বয়সী স্প্যানিশ মিডফিল্ডার এর মাধ্যমে ছুঁয়েছেন স্বদেশি আইতানা বোনমাতির রেকর্ড। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার এই পুরস্কার জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা তিনবার বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পান বোনমাতি। এবার আবার পুরস্কারটি উঠল পুতেয়াসের হাতে।
মেয়েদের ব্যালন ডি’অরে যেন স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য! টানা ছয় বছর পুরস্কারটি জিতলেন স্প্যানিশ ফুটবলাররা। ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র্যাপিনো ছাড়া আর কোনো দেশের খেলোয়াড় এই পুরস্কার জিততে পারেননি।
তবে পুতেয়াসের এবারের জয় শুধু আরেকটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি।
ভয়াবহ চোট, তারপর নতুন করে ফিরে আসা
২০২২ সালের ইউরোর ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) চোট পান পুতেয়াস। ফলে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা হয়নি তাঁর। সে বছর দ্বিতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতলেও মাঠে আগের সেই পুতেয়াসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
২০২৩ সালে স্পেন নারী বিশ্বকাপ জেতে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সাফল্যে পুতেয়াসের ভূমিকা ছিল সীমিত। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের প্রাণ, তাঁকেই বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হয়েছিল অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে।
কেমন লেগেছিল তাঁর? হয়তো ভেতরে ভেতরে পুড়েছেন, হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন—আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন?

উত্তরটা ধীরে ধীরে দিয়েছেন মাঠেই। ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করেন। পরের মৌসুমে খেলেন আরও ভালো। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে যেন পুরোনো পুতেয়াসকে পুরোপুরি ফিরে পেল ফুটবলবিশ্ব।
বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন চারটি ট্রফি। অধিনায়ক হিসেবে দলকে এনে দিয়েছেন চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের আক্রমণ গড়ে তোলার বড় দায়িত্বও এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। রানির মতোই সেই দায়িত্ব পালন করেছেন পুতেয়াস।
গোল, অ্যাসিস্ট আর মাঝমাঠের জাদু
পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তিনি গোল করেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করান, আবার মাঝমাঠ থেকে এমন সব পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে যায়।
গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২১ গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৩টি। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে গোলসংখ্যায় তৃতীয় এবং অ্যাসিস্টে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগে করেছেন সাত গোল। বার্সেলোনা জিতেছে ছয় মৌসুমে তাদের চতুর্থ ইউরোপিয়ান শিরোপা।
চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু এভা পায়োর, আলেসিয়া রুসো ও পারনিলে হার্ডার। তাঁদের প্রত্যেকেই মূলত স্ট্রাইকার। অথচ পুতেয়াস খেলেন মাঝমাঠে।
স্প্যানিশ লিগে টানা সপ্তমবার শিরোপা জেতা বার্সেলোনার হয়ে লিগে সাতটি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। এই হিসাবে যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন। ওপেন প্লে থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪০টি, যা লিগে চতুর্থ সর্বোচ্চ।
আরেকটি পরিসংখ্যানও তাঁর প্রভাবের প্রমাণ দেয়। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে শটে শেষ হওয়া আক্রমণে পুতেয়াসের অংশগ্রহণ ছিল ১৫১ বার। তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৮৯টি, যার মধ্যে ১৯টি ছিল বড় সুযোগ। আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে সফল পাস দিয়েছেন ৯৬৫টি। স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ মিলিয়ে এই দুই পরিসংখ্যানে তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না কেউ।
চ্যাম্পিয়নস লিগে একাই ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন পুতেয়াস। বায়ার্ন মিউনিখের ক্লারা বুল ছাড়া আর কেউ এত সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। ২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটিই সর্বোচ্চ।
সংখ্যাগুলো স্পষ্ট করে, পুতেয়াস শুধু মাঠে ফিরে আসেননি; নিজের পুরোনো শ্রেষ্ঠত্বকেও নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই সেরা হয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় হয়েছেন বার্সেলোনার স্ট্রাইকার এভা পায়োর, তৃতীয় ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ।
শৈশবের ক্লাবে ফিরে ১৪ বছরের রাজত্ব
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে পুতেয়াসের জন্ম। রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন। একসময় জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন। খেলেছেন স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেলে। এরপর বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায় কাটান এক বছর।
কিন্তু মেয়েদের দলটি ভেঙে যাওয়ায় বার্সেলোনা ছাড়তে হয় তাঁকে। এরপর খেলেছেন এসপানিওল ও লেভান্তেতে। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে ফিরে আসেন শৈশবের ভালোবাসার ক্লাবে।
তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন ৩৮টি ট্রফি, যার মধ্যে রয়েছে ১০টি লিগ শিরোপা ও চারটি ইউরোপিয়ান কাপ। একসময় যিনি গ্যালারিতে বসে ইনিয়েস্তাদের খেলা দেখতেন, সেই তিনিই হয়ে উঠেছেন বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
তবে সব প্রেমের গল্পের শেষ এক রকম হয় না।
২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে বার্সেলোনার সঙ্গে পুতেয়াসের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। চাইলে হয়তো থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জের ডাক উপেক্ষা করেননি তিনি।
জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে জোড়া গোল করে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে তুলে দিয়েছিলেন পুতেয়াস। ইংল্যান্ডের ‘লায়নেস’দের বিশ্বকাপে ওঠার আশা শেষ করে দেওয়ার পরের মাসেই নিজে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে!
ইংল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বেছে নেন মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প লন্ডন সিটি লায়নেসেসকে। জুলাইয়ে বার্সেলোনা ছেড়ে ইংলিশ উইমেনস সুপার লিগের ক্লাবটিতে যোগ দেন পুতেয়াস।
বিদায়ের সময় কেঁদেছেন তিনি, কেঁদেছেন তাঁর ভক্তরাও। ১৪ বছরের সম্পর্ক কি আর এত সহজে ছিন্ন করা যায়! তবু জীবন থেমে থাকে না।

নতুন ক্লাবে নতুন অধ্যায়
আগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় আরও ভালো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকি। সে কারণেই এখানে এসেছি। মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে সব সময় এগিয়ে যেতে হয়।’
নতুন ক্লাবের হয়ে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে করেছেন তিন গোল, সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট। ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ে ফুটবলের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, তা বোঝাতে এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ট।
তবে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের পর পুতেয়াস যা বলেছেন, তা হয়তো তাঁর গোল কিংবা ট্রফির চেয়েও বড়।
‘পৃথিবীর সব ছেলে ও মেয়েকে বলছি, তোমরা যদি ফুটবল ভালোবাসো, যদি ফুটবল খেলতে চাও, তাহলে খেলো। তুমি ছেলে না মেয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না। কোথা থেকে এসেছ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যদি বলে তুমি পারবে না, তার কথা শুনবে না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবে।’
রানির গল্প, যা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে
কথাগুলো শুনলে মনে পড়ে মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা। যে রাস্তায় ফুটবল খেলত, ক্যাম্প ন্যুতে বসে স্বপ্ন দেখত। তারপর একদিন নিজেই হয়ে উঠেছিল অন্যদের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা।
মাঝখানে এসেছিল ভয়ংকর চোট, হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আর প্রিয় ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু পুতেয়াস আবার ফিরেছেন। ফিরেছেন নিজের শর্তে, নিজের খেলায়।
তৃতীয় ব্যালন ডি’অর তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের মুকুটে নতুন পালক। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, বড় স্বপ্নের পথে বাধা আসতেই পারে; কিন্তু বিশ্বাস আর পরিশ্রম থাকলে ফিরে আসার পথও তৈরি হয়।
কারণ, রানি কি আর এত সহজে হারিয়ে যান!














